flexile-white-logo

বাংলাদেশের শহরের জনাকীর্ণ গলি, যেখানে প্রতি ইঞ্চি জায়গার জন্য লড়াই, সেখানে একটি ছোট্ট, বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান নতুন পথ তৈরি করছে। মিশুক অটো রিকশা, তিন যাত্রীর এই ব্যাটারিচালিত যান, শুধু পরিবহন নয়—এটি শহুরে জীবনধারার একটি পরিবর্তন। সাশ্রয়ী, দ্রুত, ও পরিবেশবান্ধব মিশুক শহরের সরু গলি ও ব্যস্ত বাজারে ছুটে চলছে। কিন্তু কী এটিকে এত বিশেষ করে তুলেছে? আর কীভাবে বাংলাদেশ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিশ্চিত করবে? চলুন, মিশুকের এই বিপ্লবের যাত্রায় উঠি।

 

শহরের গলির নিখুঁত সঙ্গী

ঢাকার ভিড়ে ঠাসা গলি বা চট্টগ্রামের বাজারের সরু পথে কল্পনা করুন। মিশুকের কমপ্যাক্ট নকশা (২৮৭০x১০৫০x১৯৮০ মিমি) ও ৪৮ভোল্ট/১০০০ ওয়াটের মোটর এই পথের জন্য তৈরি। তিন যাত্রী ও চালকসহ ৩৮০ কেজি বহন করতে পারে এই যান, ঘণ্টায় ৩০-৩৫ কিমি গতিতে, আর এক চার্জে ৫৫ কিমি পথ যায়—শহরের ছোট যাত্রার জন্য আদর্শ।

সিএনজি রিকশা, যা তিন চাকার যানের ৯০% দখল করে, দূষণ ছড়ায়। মিশুক কিন্তু শূন্য নির্গমন নিয়ে পরিবেশ রক্ষা করে। ভাড়া মাত্র ১০-২০ টাকা, অটো-রিকশার অর্ধেক, যা বাজেট-সচেতন যাত্রীদের পছন্দ। সিলেটের ব্যাংক কর্মী নুসরাত, ২৪, বলেন, “মিশুক দিয়ে যাতায়াতে টাকা বাঁচে, দুপুরের খাবার কিনতে পারি।” প্রায় ৪০ লাখ ই-রিকশা, যার মধ্যে মিশুক অন্যতম, প্রতিদিন ১১ কোটি মানুষের যাতায়াতের চাহিদা মেটাচ্ছে।

জীবনধারা ও অর্থনীতির চালিকা

মিশুক শহুরে জীবনকে নতুন রূপ দিচ্ছে। চালকদের জন্য এটি স্বাধীনতার পথ। খুলনার ইমরান, ২৯, কারখানার কম মজুরির কাজ ছেড়ে মিশুক চালান। “দিনে ১৫০০ টাকা আয় করি,” তিনি বলেন। “এটা আমার জীবন বদলেছে।” ই-রিকশা খাত, যার মূল্য ৮৭১ মিলিয়ন ডলার, লাখো তরুণ ও অদক্ষ কর্মীর জীবিকা। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, এই খাত বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলার আয় করে—ভাড়া, মেরামত, ও ব্যাটারি বিক্রির মাধ্যমে।

যাত্রীদের জন্য মিশুক একটি জীবনধারার উন্নতি। নারীদের জন্য এটি নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। ঢাকার গৃহিণী আয়েশা, ৩২, বলেন, “বাজারে যেতে মিশুক নিরাপদ, খরচও কম।” মিশুক মানুষকে কাজ, শিক্ষা, ও সামাজিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করছে, শহরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করছে।

তবে, সমস্যাও আছে। স্থানীয় ওয়ার্কশপে তৈরি নিম্নমানের মিশুক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। অপরিকল্পিত চার্জিং বিদ্যুৎ গ্রিডে চাপ ফেলে। ইউএনইপি’র ২০২০ সালের প্রতিবেদন বলছে, ১৫ লাখ ই-রিকশা বছরে ৯০,০০০ টন ব্যাটারি বর্জন তৈরি করে, যা প্রায়ই ভুলভাবে ফেলা হয়।

শহুরে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা

মিশুকের জনপ্রিয়তা বিতর্ক তৈরি করেছে। ঢাকার প্রধান সড়কে রিকশা নিষিদ্ধ, তবে গলিতে মিশুক জট তৈরি করছে। ২০১৪ সালের আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও ২০২৪ সালের মন্ত্রী পর্যায়ের আদেশ চালকদের প্রতিবাদে নামায়, কারণ তাদের জীবিকা ঝুঁকিতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০২৪ সালের ই-রিকশা বৈধকরণের প্রতিশ্রুতি ঢাকায় ‘বিজয় র‍্যালি’র উৎসব এনেছে। তবে, নিয়ন্ত্রণ এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআইডিএস)-এর ২০২৩ সালের প্রতিবেদন নিষেধাজ্ঞার বদলে নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছে:

  • নিরাপত্তা মান: যানের সার্টিফিকেশন ও চালক প্রশিক্ষণ দুর্ঘটনা কমাবে।
  • সবুজ চার্জিং হাব: সৌরশক্তিচালিত স্টেশন গ্রিডের চাপ কমাবে।
  • ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার: পরিবেশ রক্ষায় বর্জন ব্যবস্থাপনা।
  • শহুরে পরিকল্পনা: গলিতে মিশুকের জন্য নির্দিষ্ট লেন ট্রাফিক সহজ করবে।

ভারতের ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণ এর একটি আদর্শ। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি বা হাইব্রিড মডেলে বিনিয়োগ প্রযুক্তি ও রক্ষণাবেক্ষণে চাকরি তৈরি করবে।

শহুরে জীবনের ভবিষ্যৎ

মিশুক শুধু একটি প্রবণতা নয়—এটি বাংলাদেশের শহুরে ভবিষ্যৎ। ৩০-৪০ লাখ ই-রিকশা প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াত সহজ করছে। ২০২৪ সালের বৈধকরণের প্রতিশ্রুতি এটিকে সাশ্রয়ী ও সবুজ সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, যা ২০৩০ সালের টেকসই লক্ষ্যের সঙ্গে মিলে যায়। নিষেধাজ্ঞা দিলে নুসরাত বা ইমরানের মতো মানুষের জীবন থমকে যাবে।

কল্পনা করুন, পরিচ্ছন্ন শক্তিতে চলা মিশুক, নিরাপদ নকশা, ও দক্ষ চালক—যা শহরকে আরও সংযুক্ত ও পরিচ্ছন্ন করবে। এটি মিশুকের প্রতিশ্রুতি—দ্রুত, সাশ্রয়ী, ও স্বপ্ন বহনকারী।

এই যাত্রায় যোগ দিন

মিশুক বাংলাদেশের শহরের হৃৎস্পন্দন। গলিতে ছুটে চলা এই যান ছাত্র, কর্মী, ও পরিবারের জন্য আশা বয়ে আনে। কীভাবে আমরা এটিকে নিরাপদ ও টেকসই রাখব? আপনার মতামত শেয়ার করুন, একসঙ্গে মিশুক বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে বাংলাদেশের শহরকে আরও উজ্জ্বল করি।

 

লেখক পরিচিতি

মারুফ রহমান রূপসা টায়ার্সের পরিচালক এবং আইটি ও মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ। তিনি সড়ক, পরিবহন ব্যবস্থা ও যানবাহন সম্পর্কিত বিষয়ে নিয়মিত লিখেন। তার বিশেষ আগ্রহের বিষয়বস্তু পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, ইতিহাস, পর্যটন ও সড়ক নিরাপত্তা। তার লেখনীতে সড়ক নিরাপত্তা ও যানবাহনের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তার লেখার মাধ্যমে সড়ক ও পরিবহন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন।

Connect with Maruf:

Facebook | X (Twitter) | LinkedIn | Medium