মারুফ রহমান
মারুফ রহমান, বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় টায়ার ও টিউব প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রূপসা টায়ার্স অ্যান্ড কেমিক্যালস লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক। প্রতিষ্ঠাতা শফিকুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র এবং মোঃ মিরাজ রহমানের ছোট ভাই মারুফ, পারিবারিক ব্যবসায়ের ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধের সঙ্গে আধুনিক ডিজিটাল কৌশলের এক অনন্য সমন্বয় ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে সাফল্যের নতুন শিখরে নিয়ে গেছেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা রূপসা টায়ার্সকে শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানই নয়, বাংলাদেশের টায়ার শিল্পের একটি পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
মারুফ রহমান ঢাকার টিকাটুলিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা শফিকুর রহমান, রূপসা টায়ার্সের প্রতিষ্ঠাতা, এবং মা আমেনা রহমান। ১৯৮৬ সালে পরিবারটি বানানীতে স্থানান্তরিত হয়। ছোটবেলা থেকেই মারুফের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী প্রকাশ পায়। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি স্কুলে খেলাধুলার আয়োজন করতেন। ২০০৩ সালে স্বপ্ন ক্লাবের অর্থ ও বিপণন পরিচালক হিসেবে তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যান্ডগুলোর সমন্বয়ে একটি জমকালো কনসার্টের আয়োজন করেন, যা তাঁর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও বিপণন দক্ষতার প্রমাণ বহন করে।
শিক্ষাজীবনে মারুফ বানানী বিদ্যানিকেতন স্কুল থেকে ২০০১ সালে ব্যবসায় শিক্ষায় এসএসসি এবং ২০০৩ সালে ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর ২০০৪ সালে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে যান। সেখানে তিনি ২০০৫ সালে ইউনিভার্সিটি অফ উলংগং থেকে ব্যবসায় ডিপ্লোমা এবং ২০০৮ সালে সাউদার্ন ক্রস ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবসায় (বিপণন) বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। অস্ট্রেলিয়ায় থেকে তিনি বিগ ডব্লিউ নামক একটি শীর্ষস্থানীয় খুচরা প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, যেখান থেকে তিনি ভোক্তা আচরণ এবং আধুনিক বিপণন কৌশল সম্পর্কে গভীর ধারণা লাভ করেন।
রূপসা টায়ার্সে যাত্রা ও নেতৃত্ব
২০০৮ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে মারুফ ৫ নভেম্বর রূপসা টায়ার্সে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। তাঁর ভাই মিরাজ উৎপাদন, ক্রয়, অর্থ এবং হিসাব বিভাগে মনোযোগ দিলেও মারুফ বিপণন, প্রচার, ডিজিটাল বিপণন এবং তথ্যপ্রযুক্তির দিকে মনোনিবেশ করেন। তাঁর আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি রূপসা টায়ার্সকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
পণ্য সম্প্রসারণ ও গুণগত মান
প্রাথমিকভাবে রূপসা টায়ার্স রিকশা ও সাইকেলের টায়ার এবং টিউব উৎপাদনে বিশেষীকৃত ছিল। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি সিএনজি অটোরিকশা, ইজি বাইক, মিশুক এবং মোটরসাইকেলের টায়ার উৎপাদন শুরু করে, যা বাজারে তাদের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে প্রসারিত করে। মারুফ ও মিরাজ ভারতীয় টায়ার ব্র্যান্ডগুলোর আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। স্থানীয় টায়ার প্রস্তুতকারকদের নিম্নমানের পণ্যের কারণে বাজারে খারাপ খ্যাতি ছিল। তবে মারুফ ও মিরাজ তাঁদের পিতার “গুণমান প্রথম” দর্শনের প্রতি অটল থেকে শিল্পে গুণগত মানের প্রতিযোগিতার পথ তৈরি করেন। এই কৌশল প্রাথমিকভাবে ধীরগতির হলেও রূপসাকে একটি বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
ডিজিটাল রূপান্তর ও উদ্ভাবন
মারুফের নেতৃত্বে রূপসা টায়ার্স ডিজিটাল ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। তিনি বিপণন, বিক্রয় ও তথ্যপ্রযুক্তির জন্য কাস্টমাইজড সফটওয়্যার তৈরি করেন এবং প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট নিজে তৈরি করে ডিজিটাল উপস্থিতি জোরদার করেন। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় তাঁর ডিজিটাল বিপণন কৌশল রূপসার ফেসবুক পেজের অনুসারী সংখ্যা ৪ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়, যা বাংলাদেশের টায়ার কোম্পানিগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তিনি এশিয়ার প্রথম টায়ার প্রস্তুতকারক হিসেবে রূপসার অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ্লিকেশন চালু করেন, যা গ্রাহকদের পণ্য ব্রাউজিং, অর্ডার ট্র্যাকিং এবং যোগাযোগের সুবিধা প্রদান করে।
চিন্তাশীল লেখক ও শিল্পের পথপ্রদর্শক
মারুফ রহমান একজন নিবেদিত লেখক। তিনি রূপসা টায়ার্সের ব্লগ এবং মিডিয়ামে নিয়মিত টায়ার শিল্প, মোটরসাইকেল রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন প্রবণতা, টায়ার নিরাপত্তা এবং টেকসই পরিবহন বিষয়ে লেখেন। তাঁর লেখায় পরিবেশবান্ধব পরিবহন, যেমন ইলেকট্রিক রিকশা ও ই-বাইক, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা থাকে। তিনি টায়ার পুনর্ব্যবহার এবং পরিবহন নীতির ওপরও গভীর বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন, যা তাঁকে শিল্পের একজন চিন্তাশীল নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বাজারে প্রতিযোগিতা ও সামাজিক অবদান
মারুফ ও মিরাজ ভারতীয় টায়ার ব্র্যান্ডগুলোর আধিপত্য ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের গুণমান-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি স্থানীয় শিল্পকে উৎকর্ষের দিকে নিয়ে যায়। মারুফের লক্ষ্য বাংলাদেশী টায়ার ব্র্যান্ডগুলোকে বাজারে শীর্ষে নিয়ে যাওয়া। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেব, তিনি ফুটবল, ক্রিকেট ও অন্যান্য খেলাধুলার স্পনসরশিপের মাধ্যমে যুব সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখেন। তিনি বিশ্বাস করেন, খেলাধুলা তরুণদের চরিত্র গঠন ও সম্প্রদায়ের ঐক্য বৃদ্ধি করে।
ব্যক্তিগত জীবন
২০০৯ সালের নভেম্বরে মারুফ ইশরাত জাহানকে বিয়ে করেন। তাঁদের কন্যা আমিনা রহমান ২০১০ সালে এবং পুত্র মানাফ রহমান ২০১৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক জীবন তাঁর ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ের প্রতিফলন।
উপসংহার
মারুফ রহমান তাঁর পিতার গুণমান ও সততার উত্তরাধিকারকে আধুনিক উদ্ভাবনের সঙ্গে মিশিয়ে রূপসা টায়ার্সকে বাংলাদেশের শীর্ষ শিল্প প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। তাঁর ডিজিটাল উদ্ভাবন, চিন্তাশীল লেখনী এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে একজন ব্যতিক্রমী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশী টায়ার ব্র্যান্ডগুলোকে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার তাঁর স্বপ্ন এবং অটল প্রতিজ্ঞা তাঁর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্দেশ করে।
