ঢাকার সরু গলি, চট্টগ্রামের ব্যস্ত বাজার—যেখানে গাড়ি বা বাস চলতে হিমশিম খায়, সেখানে একটি ছোট্ট যান দ্রুত ছুটে চলেছে। মিশুক অটো রিকশা, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার এই যান, শহরের যাতায়াতকে বদলে দিচ্ছে। স্থানীয়ভাবে ‘ইজিবাইক’ নামে পরিচিত এই যান সাশ্রয়ী, দ্রুত, ও পরিবেশবান্ধব। কিন্তু কী এই মিশুককে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে? আর কীভাবে বাংলাদেশ এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নিশ্চিত করবে? চলুন, এই সবুজ বিপ্লবের গল্প জানি।

শহরের গলির জন্য তৈরি
ঢাকার জনাকীর্ণ গলি বা চট্টগ্রামের সরু বাজারের পথে কল্পনা করুন। মিশুক, তার কমপ্যাক্ট নকশা ও বৈদ্যুতিক শক্তি নিয়ে, এই চ্যালেঞ্জের জন্য তৈরি। মিশুক সানি মডেলে রয়েছে ৪৮ভোল্ট/১০০০ ওয়াটের মোটর ও চারটি লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি, যা তিন যাত্রী ও চালকসহ ৩৮০ কেজি বহন করতে পারে। ঘণ্টায় ৩০-৩৫ কিমি গতি ও এক চার্জে ৫৫ কিমি রেঞ্জ এটিকে শহরের ছোট যাত্রার জন্য আদর্শ করে তুলেছে।
প্রথাগত সাইকেল রিকশার তুলনায় এটি কম শ্রমসাধ্য, আর সিএনজি ‘বেবি ট্যাক্সি’র তুলনায় দূষণমুক্ত। এর ছোট আকার (২৮৭০x১০৫০x১৯৮০ মিমি) সরু পথে সহজে চলাচলের সুবিধা দেয়। যাত্রীদের জন্য ভাড়া মাত্র ১০-২০ টাকা, অন্য যানের তুলনায় অর্ধেক।
ঢাকার মিরপুরের দোকানদার সালমা বলেন, “মিশুক দ্রুত ও সস্তা। বাসের জন্য অপেক্ষা বা দরদাম করতে হয় না।” দেশে প্রায় ৪০ লাখ ই-রিকশা, যার মধ্যে মিশুক অন্যতম, প্রতিদিন ১১ কোটি মানুষের যাতায়াতের চাহিদা মেটাচ্ছে।
অর্থনীতি ও পরিবেশ: বড় প্রভাব
মিশুক শুধু যাতায়াত নয়, অর্থনীতির চালিকাশক্তি। ই-রিকশা খাতের মূল্য ৮৭১ মিলিয়ন ডলার, যা লাখো চালকের জীবিকা। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, এই খাত বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলার আয় করে—ভাড়া, মেরামত, ও ব্যাটারি বিক্রির মাধ্যমে। সিলেটের রহিম, ২৬ বছরের এক চালক, বলেন, “মিশুক আমার পরিবারের ভরসা। এখন সঞ্চয়ও করতে পারি।”
পরিবেশগতভাবেও মিশুক শহরের জন্য সুখবর। সিএনজি রিকশা, যা তিন চাকার যানের ৯০% দখল করে, দূষণ বাড়ায়। মিশুক শূন্য নির্গমন দিয়ে বায়ু পরিচ্ছন্ন রাখে। তবে, লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি বর্জন একটি চ্যালেঞ্জ। ইউএনইপি’র ২০২০ সালের প্রতিবেদন বলছে, ১৫ লাখ ই-রিকশা বছরে ৯০,০০০ টন ব্যাটারি বর্জন তৈরি করে, যা প্রায়ই অপরিকল্পিতভাবে ফেলা হয়।
চ্যালেঞ্জ: নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন
মিশুকের জনপ্রিয়তা সমস্যাও এনেছে। অনেক চালক লাইসেন্সবিহীন, আর স্থানীয় ওয়ার্কশপে তৈরি নিম্নমানের যান দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। প্রকৌশলী রেজাউল হক বলেন, “কিছু চ্যাসিস উচ্চ গতির জন্য উপযুক্ত নয়।” ঢাকার প্রধান সড়কে রিকশা নিষিদ্ধ হলেও, গলিতে মিশুক জট তৈরি করছে। অতিরিক্ত চার্জিং বিদ্যুৎ গ্রিডে চাপ ফেলছে।
২০১৪ সালের একটি আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও ২০২৪ সালের মন্ত্রী পর্যায়ের আদেশ চালকদের মধ্যে প্রতিবাদের জন্ম দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালে ই-রিকশা বৈধ করার ঘোষণা দেন, যা ঢাকায় ‘বিজয় র্যালি’র মাধ্যমে উদযাপিত হয়। তবে, নিয়ন্ত্রণ এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
টেকসই ভবিষ্যতের পথ
মিশুককে এগিয়ে নিতে দরকার স্মার্ট নীতি:
- লাইসেন্স ও মান নিয়ন্ত্রণ: চালক প্রশিক্ষণ ও যানের সার্টিফিকেশন নিরাপত্তা বাড়াবে।
- সবুজ চার্জিং: সৌরশক্তিচালিত স্টেশন গ্রিডের চাপ কমাবে।
- ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার: পরিবেশ রক্ষায় বর্জন ব্যবস্থাপনা।
- শহুরে পরিকল্পনা: নির্দিষ্ট লেন মিশুকের গলির সুবিধা বজায় রাখবে।
ভারতের ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণ এর একটি আদর্শ। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি বা হাইব্রিড মডেলে বিনিয়োগ নতুন চাকরি তৈরি করবে—প্রযুক্তি ও রক্ষণাবেক্ষণে।
দ্রুত ও সবুজ পথে
মিশুক শহরের জীবনের অংশ। ৩০-৪০ লাখ ই-রিকশা প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াত সহজ করছে। ২০২৪ সালের বৈধকরণের ঘোষণা এটিকে দ্রুত, সাশ্রয়ী, ও সবুজ সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। নিষেধাজ্ঞা দিলে সালমা বা রহিমের মতো মানুষের জীবন থমকে যাবে।
কল্পনা করুন, পরিচ্ছন্ন শক্তিতে চলা মিশুক, দক্ষ চালক, ও নিরাপদ নকশা—যা শহরকে পরিচ্ছন্ন ও সংযুক্ত রাখবে। এটি বাংলাদেশের ২০৩০ সালের টেকসই লক্ষ্যের সঙ্গে মিলে যায়।
যাত্রায় যোগ দিন
মিশুক শুধু যান নয়, এটি শহরের আশা ও স্বপ্নের বাহক। গলিতে ছুটে চলা এই যান চালকদের জীবিকা ও যাত্রীদের স্বাধীনতা বয়ে আনে। কীভাবে আমরা এটিকে দ্রুত, নিরাপদ, ও টেকসই রাখব? আপনার মতামত দিন, একসঙ্গে বাংলাদেশের শহরকে আরও উজ্জ্বল করি।
লেখক পরিচিতি
মারুফ রহমান রূপসা টায়ার্সের পরিচালক এবং আইটি ও মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ। তিনি সড়ক, পরিবহন ব্যবস্থা ও যানবাহন সম্পর্কিত বিষয়ে নিয়মিত লিখেন। তার বিশেষ আগ্রহের বিষয়বস্তু পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, ইতিহাস, পর্যটন ও সড়ক নিরাপত্তা। তার লেখনীতে সড়ক নিরাপত্তা ও যানবাহনের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তার লেখার মাধ্যমে সড়ক ও পরিবহন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন।
Connect with Maruf:
Facebook | X (Twitter) | LinkedIn | Medium
