flexile-white-logo

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা, সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যাওয়া সড়ক, তুষারপাত কিংবা হঠাৎ ধস—বিশ্বজুড়ে এমন কিছু রাস্তা আছে যেগুলো আবহাওয়ার কারণে সত্যিকার অর্থেই মৃত্যুকূপে পরিণত হয়। ২০২৫ সালে, যখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী চরম আবহাওয়ার ঘটনা ২০% বেড়েছে (NOAA, ২০২৪), তখন এই রাস্তা গুলোর দিকে আরও সতর্ক নজর দেওয়া জরুরি। এখানে আমরা তুলে ধরেছি বিশ্বের ১০টি সবচেয়ে বিপজ্জনক রাস্তা, যেগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগে রূপ নেয় মৃত্যুর ফাঁদে।

 

১. নর্থ ইউঙ্গাস রোড (ডেথ রোড), বলিভিয়া

বলিভিয়ার উত্তর ইউঙ্গাস রোডের নাম শুনলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে—স্থানীয়দের কাছে এটি “El Camino de la Muerte”, অর্থাৎ “মৃত্যুর পথ” নামে পরিচিত। ৬৪ কিমি দীর্ঘ এই পথ লা পাজ শহর থেকে শুরু হয়ে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে কোরোইকো শহরে গিয়ে শেষ হয়। একদিকে বিশাল খাড়া পাহাড়, অন্যদিকে ৬০০ মিটার গভীর খাদ। অধিকাংশ জায়গায় রাস্তার প্রস্থ মাত্র ৩.২ মিটার, যেখানে দু’টি গাড়ি একসাথে চলা প্রায় অসম্ভব। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সময় হল নভেম্বর থেকে মার্চ—বর্ষার মৌসুম। এই সময় ভারী বৃষ্টিতে রাস্তার পাথর সরে গিয়ে ভূমিধস হয়, কুয়াশা এমনভাবে ঘিরে ফেলে যে সামনের গাড়িটিও দেখা যায় না। রেলিং নেই, রাস্তার ধারে কেবল ধ্বংসস্তূপ। সরকার যদিও ২০০৬ সালে একটি বাইপাস তৈরি করেছে, তবুও সাইকেল চালক ও পর্যটকদের কাছে এটি এখনও এক রোমাঞ্চকর কিন্তু জীবনঘাতী গন্তব্য।

 

২. জোজি লা পাস, ভারত

হিমালয়ের হিমশীতল বাতাসের মাঝে, জম্মু ও কাশ্মীরের কারগিল জেলার কোলে অবস্থিত জোজি লা পাস হলো এক নিঃশ্বাস-আটকে দেওয়া অভিজ্ঞতা। ৩,৫২৮ মিটার উচ্চতার এই ৯ কিমি পথটি বছরের বেশিরভাগ সময়ই বরফে ঢাকা থাকে। শীতকালে এখানে বরফপাতের পরিমাণ এত বেশি হয় যে রাস্তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। তুষারপাতের সঙ্গে সঙ্গে তুষারধসও সাধারণ ঘটনা, যেগুলোর নিচে চাপা পড়ে বহু গাড়ি ও ট্রাক। রাস্তার এক পাশে পাহাড়ি ঢাল, অন্য পাশে খাদ, আর মাঝখানে বরফে ভেজা, পিচ্ছিল ট্র্যাক। বর্ষাকালে, আবার এই রাস্তায় দেখা দেয় নতুন বিপদ—পাহাড়ি ধস ও জলাবদ্ধতা। ২০২৬ সালে এখানে একটি টানেল চালুর কথা থাকলেও, এখনকার বাস্তবতা হলো: প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি ক্লিফ, প্রতিটি কুয়াশার স্তর মানে মৃত্যুর হাতছানি। ট্রাকচালক ও সেনাবাহিনীর জন্য এই রাস্তাটি কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং সাহসের চূড়ান্ত পরীক্ষা।

 

৩. আটলান্টিক ওশান রোড, নরওয়ে

প্রকৃতির সৌন্দর্য ও উগ্রতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ হলো আটলান্টিক ওশান রোড। নরওয়ের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে ৮ কিমি দীর্ঘ এই রাস্তা সংযুক্ত করেছে আটটি ছোট দ্বীপকে একাধিক সেতুর মাধ্যমে। সূর্যালোকে এ রাস্তা যেন একটুকরো স্বর্গ, কিন্তু শরতের ঝড়ে এটি রূপ নেয় রীতিমতো নরকে। প্রবল বাতাস ও বিশাল সাগর তরঙ্গ এমনভাবে রাস্তার ওপর আছড়ে পড়ে যে কিছু সময় সেতু ডুবে যায় পানিতে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় গাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালে এক ঝড়েই মারা গেছেন দুজন পর্যটক। শীতকালে আবার এই সেতু বরফ ও কুয়াশায় ঢাকা পড়ে। পর্যটকদের জন্য এটি একটি ‘মাস্ট-ভিজিট’ রোড ট্রিপ স্পট, কিন্তু ভুল সময়ে এখানে যাত্রা মানেই নিজের জীবন বাজি রাখা।

 

৪. কারাকোরাম হাইওয়ে, পাকিস্তান-চীন

বিশ্বের উচ্চতম আন্তর্জাতিক সড়ক, কারাকোরাম হাইওয়ে—এটি শুধু একটি রাস্তা নয়, বরং ইতিহাস, প্রকৃতি ও বিপদের সম্মিলিত রূপ। ১,৩০০ কিমি দীর্ঘ এই রুটটি পাকিস্তানের হাসনাবাদ থেকে শুরু হয়ে চীনের কাশগরে গিয়ে শেষ হয়। পথজুড়ে ছড়িয়ে আছে গিলগিট-বালতিস্তানের বরফঢাকা পর্বতমালা, যেখানে রাস্তা মাঝেমধ্যেই হারিয়ে যায় ধসে পড়া পাহাড় কিংবা বরফের নিচে। বর্ষাকালে পাহাড়ি খাল থেকে হঠাৎ পানি এসে রাস্তা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তাপমাত্রার পরিবর্তনে রাস্তার পিচ ফেটে যায়, তৈরি হয় বড় বড় গর্ত। প্রতি বছর প্রায় ৮০টি বড় দুর্ঘটনা ঘটে এই হাইওয়েতে। যদিও সম্প্রতি ২০২৪ সালে উন্নত ড্রেনেজ ও পাহাড়ি সুরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে, তারপরও এখানকার প্রকৃতি অপ্রতিরোধ্য।

 

৫. মিলিয়ন ডলার হাইওয়ে (U.S. Route 550), যুক্তরাষ্ট্র

কলোরাডোর সান জুয়ান পর্বতের কোলে ৪০ কিমি দীর্ঘ মিলিয়ন ডলার হাইওয়ে অনেকের কাছে শুধু একটি রাস্তা নয়, বরং প্রকৃতি ও সাহসিকতার মিলিত প্রতিচ্ছবি। এখানে রেলিং নেই, খাড়া বাঁকগুলো যেন সোজা খাদে নিয়ে যায়। শীতকালে পিচ্ছিল বরফ, হঠাৎ তুষারধস, কিংবা গাছ পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটে। গ্রীষ্মে আবার ঘন কুয়াশা পুরো দৃষ্টিসীমা ঢেকে দেয়। ২০২৫ সালে চালু হওয়া অ্যাভালাঞ্চ সতর্কতা ইউনিট কিছুটা দুর্ঘটনা কমাতে সাহায্য করলেও, গাড়িচালকদের জন্য এটি এখনও রীতিমতো মানসিক পরীক্ষার জায়গা।

 

৬. পাসেজ দ্য গোয়া, ফ্রান্স

ফ্রান্সের ভেন্ডে অঞ্চলের ৪.৫ কিমি দীর্ঘ এই রাস্তা দিনে দুবার জোয়ারের পানিতে ডুবে যায়। এটি একটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া রাস্তাসদৃশ পথ, যা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময়ে চলাচলের উপযুক্ত। জোয়ারের সময় পানি দ্রুতগতিতে উঠে গিয়ে গাড়িকে আটকে ফেলে। রাস্তার উপর শৈবাল জমে যাওয়ায় গাড়ি সহজেই পিছলে পড়ে। অসাবধান চালকরা প্রায়ই মাঝপথে আটকা পড়েন, আর উদ্ধারকারীদের ডাকা ছাড়া উপায় থাকে না। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর গড়ে ১০টি উদ্ধার অভিযানের দরকার হয় এখানে। ২০২৫ সালে নতুন ইলেকট্রনিক সতর্ক সাইন বসানো হলেও, বাস্তব রক্ষা নির্ভর করে সচেতনতার ওপর।

 

৭. কারাকোলেস পাস, চিলি

চিলির আন্দিজ পর্বতমালার কোলে ৩,২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত কারাকোলেস পাস, যেন একটি স্নায়ু-পরীক্ষামূলক রোলার কোস্টার। ২০ কিমি দীর্ঘ এই পথে রয়েছে ২৯টি টাইট হেয়ারপিন টার্ন, যেখানে সামান্য ভুল মানেই খাদে পড়ে যাওয়া। শীতকালে পুরো রাস্তাটি বরফে ঢেকে যায়, রাস্তার ধারে জমে থাকা তুষার থেকে ধস নামা খুব সাধারণ ঘটনা। গ্রীষ্মকালে আবার ধুলো ঝড়ে পুরো রাস্তাটি এমনভাবে ঢেকে যায় যে দিক নির্ধারণ করাও কঠিন হয়। ২০২৫ সালে কিছু সুরক্ষাবেষ্টনী যোগ করা হলেও, শ্বাস-প্রশ্বাস ঠিক রাখতে না পারলে ও গাড়ি নিয়ন্ত্রণে না রাখলে এখান থেকে ফিরতে না-ও পারেন।

 

৮. গুয়োলিয়াং টানেল রোড, চীন

হেনান প্রদেশের এই ১.২ কিমি রাস্তা খোদাই করা হয়েছে পাহাড়ের গায়ে। শীতকালে এটি বরফে ঢেকে যায়, আর গ্রীষ্মে ভূমিধসে বন্ধ হয়ে পড়ে। এখানে আলো নেই, রক্ষণাবেক্ষণও সীমিত। একটুখানি অসতর্কতাই হতে পারে শেষ যাত্রার কারণ।

 

৯. ডি৯১৫ (বায়বুর্ট-অফ রোড), তুরস্ক

এই ১০৬ কিমি পর্বত পথটি চরম সংকীর্ণ এবং উঁচুতে অবস্থান করা সবচেয়ে বিপজ্জনক রাস্তা গুলোর একটি। ৩৮টি হেয়ারপিন টার্ন ও প্রায়শই বরফ জমে থাকা রাস্তায় প্রতিবছর অনেক প্রাণহানি ঘটে। যদিও ২০২৪ সালে নির্দেশনা বোর্ড বসানো হয়েছে, রাতে চালানো এখনও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

 

১০. সিচুয়ান-তিব্বত হাইওয়ে, চীন

২,৪০০ কিমি দীর্ঘ এই হাইওয়ে আসলে একটি পর্বতাভিযানের মতো। শীতকালে তুষার ও অ্যাভালাঞ্চ, আর বর্ষাকালে কাদামাটি ধস এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতি বছর প্রায় ২০০টি দুর্ঘটনা ঘটে। টানেল সম্প্রসারণ কিছুটা সাহায্য করলেও, এখানে গাড়ি চালাতে হলে আবহাওয়া আপডেট, এমারজেন্সি কিট এবং ৪WD গাড়ি আবশ্যক।

 

প্রকৃতির রূপ একদিকে যেমন বিস্ময়কর, অন্যদিকে ভয়াবহ। এই রাস্তাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কেবল প্রযুক্তি বা গাড়ির ক্ষমতা নয়, প্রাকৃতিক শক্তিকেও সম্মান করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে সচেতনতা, প্রস্তুতি, আর সতর্কতা—এই তিনটিই আমাদের একমাত্র রক্ষাকবচ। আপনি কি কখনো এমন কোনো ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় ভ্রমণ করেছেন? আপনার অভিজ্ঞতা জানাতে ভুলবেন না।

 

লেখক পরিচিতি

মারুফ রহমান রূপসা টায়ার্সের পরিচালক এবং আইটি ও মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ। তিনি সড়ক, পরিবহন ব্যবস্থা ও যানবাহন সম্পর্কিত বিষয়ে নিয়মিত লিখেন। তার বিশেষ আগ্রহের বিষয়বস্তু পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, ইতিহাস, পর্যটন ও সড়ক নিরাপত্তা। তার লেখনীতে সড়ক নিরাপত্তা ও যানবাহনের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তার লেখার মাধ্যমে সড়ক ও পরিবহন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন।

Connect with Maruf:

Facebook | X (Twitter) | LinkedIn | Medium