flexile-white-logo

বাংলাদেশের এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক গত এক দশকে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে, যা দেশের পরিবহন, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই এক্সপ্রেসওয়েগুলো শহর, জেলা ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে সংযুক্ত করে যাতায়াতের সময় কমিয়েছে এবং ট্রাফিক জটিলতা হ্রাস করেছে। এই ব্লগে আমরা বাংলাদেশের বিদ্যমান, নির্মাণাধীন এবং পরিকল্পিত এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পগুলোর একটি বিস্তারিত পর্যালোচনা করব। চলুন, এই যাত্রায় শরিক হই এবং জেনে নিই কীভাবে এই রাস্তাগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়ছে!

বিদ্যমান এক্সপ্রেসওয়ে: অর্থনীতির মেরুদণ্ড

বর্তমানে বাংলাদেশে দুটি এক্সপ্রেসওয়ে চালু রয়েছে, যা দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

১. ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে

৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই এক্সপ্রেসওয়ে ঢাকাকে ফরিদপুরের ভাঙ্গার সঙ্গে সংযুক্ত করে। পদ্মা সেতুর সঙ্গে সমন্বিত এই রাস্তা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে ত্বরান্বিত করেছে। এটি যাতায়াতের সময় অর্ধেকে কমিয়েছে এবং ঢাকা-খুলনা রুটে ট্রাফিক জটিলতা হ্রাস করেছে। এই এক্সপ্রেসওয়ে বাংলাদেশের প্রথম সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারের রাস্তা, যা বাণিজ্য ও যাত্রী পরিবহনে বিপ্লব এনেছে।

২. ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

১৯.৭৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই উড়াল মহাসড়ক ২০২৩ সালে আংশিক উদ্বোধন করা হয়। এটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালির সঙ্গে সংযুক্ত করে। এই রাস্তা ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে যাতায়াতের সময় ২ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ২০ মিনিটে নামিয়েছে, যা শহরের ট্রাফিক সমস্যা সমাধানে মাইলফলক।

নির্মাণাধীন এক্সপ্রেসওয়ে: ভবিষ্যতের পথ

বাংলাদেশে বর্তমানে বেশ কয়েকটি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণাধীন, যা আগামী কয়েক বছরে পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে।

১. চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই উড়াল মহাসড়ক, যা শাহ আমানত বিমানবন্দর ফ্লাইওভার প্রকল্প নামে পরিচিত, চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরকে বাণিজ্য কেন্দ্র লালখান বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এটি চট্টগ্রামের ট্রাফিক জটিলতা কমাবে এবং বন্দরনগরীর ব্যবসায়িক গতিশীলতা বাড়াবে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২. ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে

৪৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই এক্সপ্রেসওয়ে জয়দেবপুর, দেবগ্রাম, ভুলতা ও মদনপুরকে সংযুক্ত করে ঢাকা শহরকে বাইপাস করবে। এটি শহরের অভ্যন্তরীণ ট্রাফিক জটিলতা কমাবে এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নত করবে। প্রকল্পটি ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল, তবে কোভিড-১৯ এবং জমি অধিগ্রহণের সমস্যার কারণে এটি ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে।

৩. পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে

১২.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই টোল রোড গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলাকে সংযুক্ত করবে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজুক) পরিচালিত এই প্রকল্পটি পূর্বাচল নতুন শহরের সঙ্গে পূর্ব ঢাকার যোগাযোগ সহজ করবে। এটি ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে উদ্বোধনের কথা ছিল, তবে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এটি ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সম্পন্ন হতে পারে।

৪. ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

২৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই উড়াল মহাসড়ক হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আব্দুল্লাহপুর, আশুলিয়া, বাইপাইল ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের ঢাকা এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ডিইপিজেড) এর সঙ্গে সংযুক্ত করবে। চায়না এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত এই প্রকল্পটি ২০২৬ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি ৩০টি জেলার ৪ কোটি মানুষের ঢাকায় প্রবেশ ও প্রস্থান সহজ করবে।

অনুমোদিত কিন্তু নির্মাণ শুরু হয়নি এমন প্রকল্প

কয়েকটি এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প পরিকল্পনা ও অনুমোদন পর্যায়ে রয়েছে, যা শীঘ্রই নির্মাণ শুরু হবে।

১. ভাঙ্গা-বেনাপোল এক্সপ্রেসওয়ে

১২৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই প্রস্তাবিত এক্সপ্রেসওয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গাকে নাগরকান্দা, মুকসুদপুর ও লোহাগড়া হয়ে বেনাপোলের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এটি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ উন্নত করবে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালে নির্মাণ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২. ঢাকা পূর্ব-পশ্চিম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

এই এক্সপ্রেসওয়ে হেমায়েতপুর, নিমতলী, কেরানীগঞ্জ, একুরিয়া, জানজিরা, ফতুল্লাহ, হাজীগঞ্জ বন্দর ও মদনপুর হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এটি ঢাকার পূর্ব-পশ্চিম সংযোগ উন্নত করবে এবং শিল্পাঞ্চলের ট্রাফিক জটিলতা কমাবে। প্রকল্পটির নির্মাণ ২০২৬ সালের শুরুতে শুরু হতে পারে।

৩. রামপুরা-আমুলিয়া-ডেমরা এক্সপ্রেসওয়ে

এই প্রস্তাবিত এক্সপ্রেসওয়ে ঢাকাকে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও সিলেটের মতো পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এটি ঢাকার পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্য ও শিল্প উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। নির্মাণ শুরুর সময় এখনো নির্ধারিত হয়নি।

পরিকল্পিত এক্সপ্রেসওয়ে: ভবিষ্যতের স্বপ্ন

বাংলাদেশ সরকারের “হাইওয়ে মাস্টার প্ল্যান ২০৪১” এর অধীনে বেশ কয়েকটি এক্সপ্রেসওয়ে প্রস্তাবিত হয়েছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • গাবতলী-নবীনগর-পটুয়ারিয়া এক্সপ্রেসওয়ে: ঢাকার উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ২৮টি জেলার সঙ্গে সংযোগ উন্নত করবে।
  • তামাবিল-গুন্ডুম এক্সপ্রেসওয়ে: ৫৪৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই প্রস্তাবিত এক্সপ্রেসওয়ে তামাবিল থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে, যা ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াবে।
  • গোবরাকুড়া-পায়রা বন্দর এক্সপ্রেসওয়ে: ৩৭৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই রাস্তা ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর ও বরিশাল হয়ে পায়রা বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত হবে।
  • কোটালিপাড়া-মোংলা বন্দর এক্সপ্রেসওয়ে: দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর ও বাণিজ্য কেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে।
  • বুড়িমারি-ভোমরা এক্সপ্রেসওয়ে: উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করবে।
  • বাংলাবান্ধা-জলঢাকা এক্সপ্রেসওয়ে: ৮৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই রাস্তা ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াবে।
  • জয়পুরহাট-তামাবিল এক্সপ্রেসওয়ে: ২২৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই রাস্তা উত্তরাঞ্চল ও সিলেটের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করবে।
  • সোনামসজিদ-ব্রাহ্মণবাড়িয়া এক্সপ্রেসওয়ে: ৩১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই রাস্তা রাজশাহী ও রংপুরের সঙ্গে চট্টগ্রাম ও সিলেটের দূরত্ব কমাবে।
  • বেনাপোল-লক্ষ্মীপুর এক্সপ্রেসওয়ে: ২৯৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই রাস্তা খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যে দূরত্ব ২০০ কিলোমিটার কমাবে।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বাংলাদেশের এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে জমি অধিগ্রহণ, অর্থায়নের ঘাটতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা-আশুলিয়া প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ ও কোভিড-১৯ এর কারণে বিলম্ব হয়েছে। তবে, “ভিশন ২০৪১” এবং “হাইওয়ে মাস্টার প্ল্যান ২০৪১” এর অধীনে সরকার ১.৯১ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনা করেছে, যা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকে ত্বরান্বিত করবে। এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্ক ও SAARC, BIMSTEC-এর মতো আঞ্চলিক উদ্যোগের সঙ্গে সংযোগ বাংলাদেশকে বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করবে। এই এক্সপ্রেসওয়েগুলো কি বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেবে?

উপসংহার

বাংলাদেশের এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক দেশের পরিবহন ব্যবস্থাকে রূপান্তরিত করছে। ঢাকা-ভাঙ্গার মতো বিদ্যমান রাস্তা থেকে তামাবিল-গুন্ডুমের মতো পরিকল্পিত প্রকল্প—প্রতিটি এক্সপ্রেসওয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আঞ্চলিক সংযোগের নতুন দ্বার উন্মোচন করছে। আপনি কোন এক্সপ্রেসওয়েতে যাতায়াত করেছেন? আপনার এলাকায় কোন নতুন এক্সপ্রেসওয়ে প্রয়োজন? মন্তব্যে আপনার মতামত শেয়ার করুন এবং এই আলোচনায় আমাদের সঙ্গী হোন!

 

লেখক সম্পর্কে

মারুফ রহমান রূপসা টায়ার্সের পরিচালক এবং আইটি ও মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ। তিনি সড়ক, পরিবহন ব্যবস্থা ও যানবাহন সম্পর্কিত বিষয়ে নিয়মিত লিখেন। তার বিশেষ আগ্রহের বিষয়বস্তু পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, ইতিহাস, পর্যটন ও সড়ক নিরাপত্তা। তার লেখনীতে সড়ক নিরাপত্তা ও যানবাহনের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তার লেখার মাধ্যমে সড়ক ও পরিবহন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন।

Connect with Maruf:

Facebook | X (Twitter) | LinkedIn | Medium