সমুদ্রের বুক চিরে শহর সংযোগ করা বা পাহাড় কেটে মহাসড়ক তৈরির মূল্য কত হতে পারে? কিছু সড়কের জন্য এর উত্তর কয়েক বিলিয়ন ডলার—যা প্রকৃতির সীমাবদ্ধতা ও নগর জটিলতার মুখোমুখি হয়ে প্রকৌশলের অসাধারণ কৃতিত্ব প্রকাশ করে। ২০২৫ সালে, নির্মাণ খরচ ২০২০ সালের তুলনায় ৫০% বেড়েছে (ইনো সেন্টার ফর ট্রান্সপোর্টেশন), এবং বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সড়কগুলো মানব উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক। চীনের সমুদ্র-অতিক্রমকারী সেতু থেকে দুবাইয়ের আকাশচুম্বী-সারিবদ্ধ মহাসড়ক—আসুন জেনে নিই বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ১০টি সড়ক, যেখানে সর্বশেষ তথ্য ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সংযোগের পেছনের বিশাল বিনিয়োগ প্রকাশ পায়।
১. হংকং-ঝুহাই-ম্যাকাও সেতু – চীন
২০১৮ সালে নির্মিত হংকং-ঝুহাই-ম্যাকাও সেতু (এইচজেডএমবি) বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র-অতিক্রমকারী সেতু, যা ৫৫ কিলোমিটার জুড়ে হংকং, ম্যাকাও ও ঝুহাইকে সংযুক্ত করে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, এর নির্মাণে খরচ হয়েছে ২০ বিলিয়ন ডলার। তিনটি কেবল-স্টেড সেতু, ৬.৭ কিলোমিটারের একটি সমুদ্রতলের সুড়ঙ্গ এবং চারটি কৃত্রিম দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই সেতু ঝড় ও ভূমিকম্প সহ্য করার জন্য নির্মিত। প্রতিদিন ১,৫৬,০০০ যাত্রী এটি ব্যবহার করে (ঝুহাই বন্দর, জানুয়ারি ২০২৫)। প্রাথমিকভাবে পারমিট সীমাবদ্ধতার কারণে ট্রাফিক কম হলেও, এটি গ্রেটার বে এরিয়ার অর্থনৈতিক একীকরণের মূল ভিত্তি।
২. বিগ ডিগ (সেন্ট্রাল আর্টারি/টানেল প্রজেক্ট) – বোস্টন, যুক্তরাষ্ট্র
২০০৭ সালে সম্পন্ন বোস্টনের বিগ ডিগ প্রকল্প একটি উঁচু হাইওয়েকে ৮-১০ লেনের ভূগর্ভস্থ এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে প্রতিস্থাপন করে এবং আই-৯০কে লোগান বিমানবন্দর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। ২০২৩ সালের হিসেবে এর খরচ ১৪.৮ বিলিয়ন ডলার। জাকিম বাঙ্কার হিল সেতু সহ এই প্রকল্প বিমানবন্দরে যাতায়াতের সময় ৭২% কমিয়েছে। ১৯৯১ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প খরচ বৃদ্ধি ও ফুটো সমস্যার মুখোমুখি হলেও বোস্টনের ওয়াটারফ্রন্টকে পার্কল্যান্ডে রূপান্তরিত করেছে। প্রতিদিন ৫ লাখ গাড়ি পরিচালনা করে এটি নগর অবকাঠামো আধুনিকীকরণের একটি মানদণ্ড।
৩. টোকিও বে অ্যাকোয়া-লাইন – জাপান
১৯৯৭ সালে নির্মিত টোকিও বে অ্যাকোয়া-লাইন ১৫ কিলোমিটার জুড়ে কাওয়াসাকি ও কিসারাজুকে সংযুক্ত করে। ১১.৩ বিলিয়ন ডলার খরচে নির্মিত এটি ৯.৬ কিলোমিটার সেতু ও ৪.৪ কিলোমিটারের বিশ্বের দীর্ঘতম ভূগর্ভস্থ সড়ক সুড়ঙ্গ নিয়ে গঠিত (জাপানের ভূমি মন্ত্রণালয়, ২০২৪)। উমিহোতারু বিশ্রাম এলাকা, যেখানে একটি জাদুঘর ও পর্যবেক্ষণ ডেক রয়েছে, বছরে ২০ লাখ পর্যটক আকর্ষণ করে। যাতায়াতের সময় ৪৫ মিনিট কমিয়ে এটি টোকিওর বন্দর সংযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪. মেরিনা কোস্টাল এক্সপ্রেসওয়ে – সিঙ্গাপুর
২০১৩ সালে উদ্বোধিত সিঙ্গাপুরের মেরিনা কোস্টাল এক্সপ্রেসওয়ে ৫ কিলোমিটারের ১০-লেনের মহাসড়ক, যার মধ্যে ৪২০ মিটারের একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ রয়েছে। ৪.৩ বিলিয়ন ডলার খরচে নির্মিত এটি নরম সামুদ্রিক মাটির মধ্য দিয়ে লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি। প্রতিদিন ২ লাখ গাড়ি পরিচালনা করে এটি চাঙ্গি বিমানবন্দরের কাছে যানজট কমায় (ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, ২০২৫)। সিঙ্গাপুরের স্থান ও নির্ভুলতার উপর প্রিমিয়াম এর উচ্চ খরচের কারণ।
৫. শেখ জায়েদ রোড (ই১১) – দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত
১৯৯০ সালে নির্মিত দুবাইয়ের শেখ জায়েদ রোড ৫৫ কিলোমিটারের ১২-লেনের মহাসড়ক, যার খরচ ২ বিলিয়ন ডলার (ইউএই রোডস অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, ২০২৪)। বুর্জ খলিফার মতো আকাশচুম্বী ভবন দিয়ে ঘেরা এটি দুবাইয়ের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড, প্রতিদিন ১০ লাখ গাড়ি পরিচালনা করে। এর ইন্টারচেঞ্জ ও মেট্রো সংযোগ দুবাইয়ের বিলাসবহুল অবকাঠামোর প্রতীক। তৎকালীন সময়ে এর খরচ ছিল বিশাল, যা দুবাইকে আধুনিকতার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
৬. ড্যান রায়ান এক্সপ্রেসওয়ে পুনর্নির্মাণ – শিকাগো, যুক্তরাষ্ট্র
২০০৬ থেকে ২০১০ সালে পুনর্নির্মিত শিকাগোর ড্যান রায়ান এক্সপ্রেসওয়ের খরচ ১.৫ বিলিয়ন ডলার (ইলিনয় ডিপার্টমেন্ট অফ ট্রান্সপোর্টেশন, ২০২৪)। ১৮ কিলোমিটারের এই প্রকল্পে লেন প্রশস্তকরণ, র্যাম্প যোগ ও রেড লাইন ট্রানজিট স্টেশন আধুনিকীকরণ করা হয়। প্রতিদিন ৩ লাখ গাড়ি পরিচালনা করে এটি শিকাগোর দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী। সেতু ও প্রতিরোধক দেয়ালের জটিলতা আধুনিক চাহিদার জন্য নগর মহাসড়ক আপগ্রেডের উচ্চ খরচ প্রকাশ করে।
৭. জোজিলা টানেল – ভারত
২০২৬ সালে সম্পন্ন হতে যাওয়া জোজিলা টানেল হিমালয়ে ১৪.২ কিলোমিটারের একটি প্রকৌশল বিস্ময়, যার খরচ ১.০৫ বিলিয়ন ডলার (ভারতের সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, ২০২৫)। লাদাখ ও কাশ্মীরকে সংযুক্ত করে এটি ভারী তুষারেও সারাবছর সংযোগ নিশ্চিত করে, যাতায়াতের সময় ৩.৫ ঘণ্টা থেকে ১৫ মিনিটে নামিয়ে আনে। বায়ুচলাচল, অগ্নি নিরাপত্তা ও জরুরি ব্যবস্থা এটিকে কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে। উচ্চ খরচ উঁচু পাহাড়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণের চ্যালেঞ্জ প্রতিফলিত করে।
৮. ইন্টারস্টেট ৩৫ই হট লেন – টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র
২০১৭ সালে সম্পন্ন টেক্সাসের আই-৩৫ই হাই অকুপেন্সি টোল (হট) লেনের খরচ ২১১ মিলিয়ন ডলার। ৪৫ কিলোমিটারের এই প্রকল্পে বিপরীতমুখী ম্যানেজড লেন, ইলেকট্রনিক টোল ও ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে। প্রতিদিন ১.৫ লাখ গাড়ি পরিচালনা করে এটি যানজট কমায় ও নির্গমন হ্রাস করে। এর তুলনামূলক কম খরচ দক্ষ পরিকল্পনার প্রতীক, যদিও গতিশীল মূল্য নির্ধারণ নিয়ে স্থানীয় বিতর্ক রয়েছে।
৯. গেবজে-ওরহানগাজি-ইজমির মোটরওয়ে (ওটোয়োল ৫) – তুরস্ক
২০১৯ সালে নির্মিত তুরস্কের ৪২৬ কিলোমিটারের এই মোটরওয়ের খরচ ৭ বিলিয়ন ডলার। ইজমিত বে সেতু ও ৩১টি ভায়াডাক্ট সহ এটি ইস্তাম্বুল-ইজমির যাতায়াতের সময় অর্ধেক করে চার ঘণ্টার নিচে নামিয়েছে। প্রতিদিন ১ লাখ গাড়ি পরিচালনা করে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক করিডর। জটিল ভূখণ্ড ও সাসপেনশন সেতুর কারণে উচ্চ খরচ তুরস্কের বিশ্বমানের অবকাঠামোর প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করে।
১০. দুরাঙ্গো-মাজাতলান হাইওয়ে – মেক্সিকো
২০১৩ সালে উদ্বোধিত মেক্সিকোর ২৩০ কিলোমিটারের এই হাইওয়ের খরচ ১.৪ বিলিয়ন ডলার। ৬৩টি সুড়ঙ্গ ও ১১৫টি সেতু, যার মধ্যে ১,১২৪ মিটারের বালুয়ার্তে সেতু রয়েছে, এটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় বন্দরগুলোকে অভ্যন্তরীণ শহরের সঙ্গে সংযুক্ত করে। প্রতিদিন ৫০,০০০ গাড়ি পরিচালনা করে এটি যাতায়াতের সময় তিন ঘণ্টা কমিয়েছে। পাহাড়ি ভূখণ্ড ও ভূমিকম্প-প্রতিরোধী নকশার কারণে উচ্চ খরচ মেক্সিকোর আধুনিকীকরণ প্রচেষ্টার প্রতীক।
উপসংহার
সমুদ্র-অতিক্রমকারী সেতু থেকে পাহাড় কাটা সুড়ঙ্গ, এই সড়কগুলো শুধু অবকাঠামো নয়—এগুলো মানব প্রকৌশল ও অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার দুঃসাহসী প্রকাশ। বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে এগুলো প্রাকৃতিক বাধা, নগর যানজট ও কৌশলগত প্রয়োজন মোকাবিলা করে, অঞ্চলের রূপান্তর ঘটায়। নির্মাণ খরচ বাড়ার সঙ্গে এই প্রকল্পগুলো অগ্রগতি ও মূল্যের ভারসাম্য প্রকাশ করে। কোন সড়কের গল্প আপনাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে? আপনার মতামত শেয়ার করুন বা এই প্রকৌশল বিস্ময়গুলোর একটিতে ভ্রমণের পরিকল্পনা করুন!
লেখক পরিচিতি
মারুফ রহমান রূপসা টায়ার্সের পরিচালক এবং আইটি ও মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ। তিনি সড়ক, পরিবহন ব্যবস্থা ও যানবাহন সম্পর্কিত বিষয়ে নিয়মিত লিখেন। তার বিশেষ আগ্রহের বিষয়বস্তু পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, ইতিহাস, পর্যটন ও সড়ক নিরাপত্তা। তার লেখনীতে সড়ক নিরাপত্তা ও যানবাহনের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তার লেখার মাধ্যমে সড়ক ও পরিবহন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন।
Connect with Maruf:
Facebook | X (Twitter) | LinkedIn | Medium

I don’t think the title of your article matches the content lol. Just kidding, mainly because I had some doubts after reading the article.
Your article helped me a lot, is there any more related content? Thanks! https://accounts.binance.com/cs/register-person?ref=OMM3XK51