flexile-white-logo

বাংলাদেশের গ্রামের সরু পথ থেকে শহরের ব্যস্ত রাস্তা—ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার এই যান, লাখো মানুষের জন্য জীবনযাত্রার অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে অনেকে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে কথা বলছেন। কিন্তু বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআইডিএস)-এর সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, নিষেধ নয়, নিয়ন্ত্রণই এর সমাধান। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইজিবাইককে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, আর টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি করে তুলতে পারে। কীভাবে? চলুন, জেনে নিই।

ইজিবাইক: জীবিকা ও সংযোগের সেতু

ইজিবাইক শুধু পরিবহন নয়, এটি সাশ্রয়ী ও সহজলভ্যতার প্রতীক। গ্রামের এক কৃষক বাজারে ফসল নিয়ে যাচ্ছেন, বা এক নারী শহরে কাজে ছুটছেন—ইজিবাইক তাদের পথ সহজ করেছে। বিআইডিএস-এর ২০২৩ সালের গবেষণা বলছে, দেশে ১৫ লাখের বেশি ইজিবাইক চলছে, যা নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য বাস বা অটো-রিকশার তুলনায় অনেক সস্তা। মাত্র ১০-২০ টাকায় যাত্রীরা স্কুল, বাজার, বা ক্লিনিকে পৌঁছাচ্ছেন।

চালকদের জন্য এটি জীবিকার পথ। বগুড়ার রফিক, ২৬ বছরের এক তরুণ, বলেন, “আগে কাজ ছিল না। এখন ইজিবাইক চালিয়ে পরিবার চালাই।” তার মতো লাখো তরুণ এই খাতে কাজ পেয়েছেন। নারীদের জন্যও ইজিবাইক নিরাপদ যাতায়াতের মাধ্যম, যা তাদের শিক্ষা, কাজ, আর সামাজিক সুযোগে পৌঁছে দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক শক্তি, সামাজিক পরিবর্তন

ইজিবাইক অর্থনীতির চাকা ঘোরাচ্ছে। ২০২৪ সালের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই খাত বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অবদান রাখছে—ভাড়া, মেরামত, আর ব্যাটারি বিক্রির মাধ্যমে। যাত্রীরা খরচ বাঁচিয়ে খাবার, শিক্ষা, বা ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। গ্রামে, যেখানে পরিবহন দুর্লভ, ইজিবাইক সম্প্রদায়কে শক্তিশালী করছে।

নারীদের জন্য এর প্রভাব বিশেষ। খুলনার শিরিন, একজন গৃহকর্মী, বলেন, “ইজিবাইকের জন্য আমি নিয়মিত কাজে যাই, স্বাধীনভাবে।” এটি নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলছে, তাদের অর্থনীতিতে অংশ নিতে সাহায্য করছে।

চ্যালেঞ্জ: নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন

ইজিবাইকের জনপ্রিয়তা সমস্যাও তৈরি করছে। ঢাকার মতো শহরে এটি রাস্তার জট বাড়াচ্ছে। লাইসেন্সবিহীন চালক ও নিম্নমানের যান দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছে। ব্যাটারি চার্জিং বিদ্যুৎ গ্রিডে চাপ ফেলছে, আর ভুলভাবে ব্যাটারি ফেললে পরিবেশের ক্ষতি হয়। কিছু এলাকায় নিষেধাজ্ঞার কথা উঠলেও, এটি লাখো জীবিকা ও সাশ্রয়ী পরিবহন বন্ধ করে দেবে।

বিআইডিএস-এর গবেষণা নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছে:

  • লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ: চালকদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা।
  • সবুজ চার্জিং স্টেশন: সৌরশক্তিচালিত স্টেশন গ্রিডের চাপ কমাবে।
  • ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার: পরিবেশ রক্ষায় বর্জন ব্যবস্থাপনা।
  • নির্দিষ্ট রুট: শহরে জট কমাতে ইজিবাইকের জন্য নির্দিষ্ট পথ।

টেকসই ভবিষ্যতের পথ

নিয়ন্ত্রণ শুধু সমস্যার সমাধান নয়, নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। ভারতের ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এর একটি আদর্শ। উন্নত ব্যাটারি বা হাইব্রিড মডেলে বিনিয়োগ নতুন চাকরি তৈরি করবে—যান্ত্রিক মেরামত, চার্জিং স্টেশন, আর প্রযুক্তি উন্নয়নে। এটি বাংলাদেশের ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে মিলে যায়, বিশেষ করে দূষণ ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায়।

নিষেধাজ্ঞা দিলে জীবিকা ও গতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইজিবাইক হতে পারে সবুজ, সাশ্রয়ী, ও সবার জন্য পরিবহনের মডেল। কল্পনা করুন, সৌরশক্তিতে চলা ইজিবাইক, দক্ষ চালক, আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ—এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

এগিয়ে যাওয়ার পথে

ইজিবাইক শুধু যান নয়, এটি আশা ও অগ্রগতির প্রতীক। নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন দুটি পথ: এই শিল্পকে দমিয়ে দেওয়া, নাকি এটিকে টেকসই করে গড়ে তোলা। নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আমরা ইজিবাইককে বাংলাদেশের উন্নতির চালিকাশক্তি করতে পারি। আপনার কী মনে হয়? এই সবুজ বিপ্লবকে এগিয়ে নিতে আমরা কী করতে পারি? আপনার মতামত শেয়ার করুন, একসঙ্গে বাংলাদেশের পথকে আরও উজ্জ্বল করি।

 

লেখক পরিচিতি

মারুফ রহমান রূপসা টায়ার্সের পরিচালক এবং আইটি ও মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ। তিনি সড়ক, পরিবহন ব্যবস্থা ও যানবাহন সম্পর্কিত বিষয়ে নিয়মিত লিখেন। তার বিশেষ আগ্রহের বিষয়বস্তু পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, ইতিহাস, পর্যটন ও সড়ক নিরাপত্তা। তার লেখনীতে সড়ক নিরাপত্তা ও যানবাহনের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। তার লেখার মাধ্যমে সড়ক ও পরিবহন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন।

Connect with Maruf:

Facebook | X (Twitter) | LinkedIn | Medium