flexile-white-logo

একটি সড়ক কেন মৃত্যুপথ হয়ে ওঠে? সরু রাস্তা, খাড়া পাহাড়, অপ্রত্যাশিত ট্রাফিক, বা বরফের পিচ্ছিল পথ—এসবই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। ২০২৫ সালে, বিশ্বে প্রতি বছর ১৩ লাখ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় (WHO, ২০২৪)। নকশার ত্রুটি, চালকের অসচেতনতা, এবং প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে কিছু সড়ক কুখ্যাত। এই তালিকায় আমরা বিশ্বের ১০টি সবচেয়ে বিপজ্জনক সড়ক নিয়ে আলোচনা করব, যেখানে প্রতিটি মোড়ে লুকিয়ে আছে মৃত্যুর ছায়া।

১. নর্থ ইউঙ্গাস রোড (ডেথ রোড) – বলিভিয়া

বলিভিয়ার লা পাজ থেকে কোরোইকো পর্যন্ত ৬৪ কিমি লম্বা নর্থ ইউঙ্গাস রোড, যা “ডেথ রোড” নামে কুখ্যাত, মাত্র ৩.২ মিটার চওড়া পাথুরে পথ আর ৬০০ মিটার গভীর খাদ নিয়ে গঠিত। ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ১৯৯৫ সালে এটিকে এ নাম দেয়। একসময় এখানে বছরে ২০০-৩০০ জনের মৃত্যু হতো (প্রতি মাইলে ৪.৭-৭ মৃত্যু)। ২০০৬ সালে বাইপাস রাস্তা তৈরির পর যানবাহনের দুর্ঘটনা কমলেও, বর্তমানে বছরে ২০-৩০টি দুর্ঘটনা ঘটে, বেশিরভাগই সাইকেল চালকদের (বলিভিয়া পাবলিক ওয়ার্কস মন্ত্রণালয়, ২০২৪)। কুয়াশা, ভূমিধস, এবং গার্ডরেলের অভাব এর ঝুঁকি বাড়ায়। ধীর গতিতে চলা এবং গাইডেড ট্যুর এখানে অপরিহার্য।

২. কমনওয়েলথ অ্যাভিনিউ (কিলার হাইওয়ে) – ফিলিপাইন

ফিলিপাইনের কুইজন সিটিতে ১২.৬ কিমি লম্বা কমনওয়েলথ অ্যাভিনিউ প্রতিদিন গড়ে ৫টি মৃত্যু দেখে (প্রতি মাইলে ২৩৭ মৃত্যু), ফিলিপাইন পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী (২০২৪)। ১৮টি লেনের এই সড়কে রাস্তার চিহ্ন, সিগন্যাল, বা পথচারী ক্রসিং নেই, যা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং দুর্বল আইন প্রয়োগে বছরে ১,৮০০টি দুর্ঘটনা ঘটে। ২০১০ সালে একটি বাস দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়। ২০২৫ সালে স্পিড ক্যামেরা এবং লেন বিভাজক স্থাপন করা হলেও, এই জনাকীর্ণ সড়কে সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি।

৩. বিআর-১১৬ (হাইওয়ে অফ ডেথ) – ব্রাজিল

ব্রাজিলের ফর্তালেজা থেকে জাগুয়ারাও পর্যন্ত ৪,৩৮৫ কিমি বিস্তৃত বিআর-১১৬ সড়কে বছরে ৬,৫০০ জনের মৃত্যু হয় (প্রতি মাইলে ১.৪৮ মৃত্যু), ব্রাজিল ফেডারেল হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী (২০২৫)। সাও পাওলো-বাহিয়া অংশে ডাকাতি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, এবং ভূমিধস ঝুঁকি বাড়ায়। ২০১৬ সালে একটি বাস দুর্ঘটনায় ৫৪ জন নিহত হয়। ভারী ট্রাক এবং পশু পারাপার এর বিপদ আরও বাড়ায়। ২০২৪ সালে টহল বাড়ানো হলেও, ওজন পরীক্ষার স্টেশন এবং রাস্তার উন্নতি জরুরি।

৪. ইন্টারস্টেট ৪৫ (গালফ ফ্রিওয়ে) – টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র

টেক্সাসের ডালাস থেকে গালভেস্টন পর্যন্ত ২৮৪.৯ মাইলের ইন্টারস্টেট ৪৫-এ প্রতি মাইলে ০.৯১৩ মৃত্যু (বছরে ২৬০ মৃত্যু), এনএইচটিএসএ তথ্য অনুযায়ী (২০২৪)। শহুরে ভিড়, দ্রুতগতির গাড়ি, এবং মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো দুর্ঘটনার কারণ। হিউস্টনের অংশে ২০১১-২০১৫ সালে ৫১টি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে। ২০২৫ সালে গতি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হলেও, সতর্ক গাড়ি চালানো অপরিহার্য।

৫. রুট ১৯২ (আর্লো ব্রনসন মেমোরিয়াল হাইওয়ে) – ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র

ফ্লোরিডার কিসিমির ৭৫.৪ মাইলের রুট ১৯২-এ প্রতি মাইলে ০.৮৬৭ মৃত্যু (বছরে ৬৫ মৃত্যু), ফ্লোরিডা হাইওয়ে সেফটি তথ্য অনুযায়ী (২০২৫)। পর্যটকদের ভিড়, অমনোযোগী গাড়ি চালানো, এবং পথচারী ক্রসিং এর ঝুঁকি বাড়ায়। ২০১৯ সালে একটি হিট-অ্যান্ড-রান দুর্ঘটনায় ১২ বছরের একটি শিশু নিহত হয়। ২০২৪ সালে নতুন সিগন্যাল স্থাপন করা হলেও, সচেতনতা প্রচারণা অত্যন্ত প্রয়োজন।

৬. ইন্টারস্টেট ১৭ (ব্ল্যাক ক্যানিয়ন ফ্রিওয়ে) – অ্যারিজোনা, যুক্তরাষ্ট্র

অ্যারিজোনার ফিনিক্স থেকে ফ্ল্যাগস্টাফ পর্যন্ত ১৪৫.৮ মাইলের ইন্টারস্টেট ১৭-এ প্রতি মাইলে ০.৭০৭ মৃত্যু (বছরে ১০৩ মৃত্যু), এনএইচটিএসএ তথ্য অনুযায়ী (২০২৪)। খাড়া ঢাল, মরুভূমির তাপ, এবং আক্রমণাত্মক গাড়ি চালানো দুর্ঘটনার কারণ। ২০১৭ সালে একটি ভুল পথে গাড়ি চালানোর দুর্ঘটনায় ৫ জন নিহত হয়। ২০২৫ সালে বাঁকের সতর্কতা চিহ্ন স্থাপন করা হলেও, ধীর গতিতে চলা জরুরি।

৭. জেমস ডালটন হাইওয়ে (হল রোড) – আলাস্কা, যুক্তরাষ্ট্র

আলাস্কার লিভেনগুড থেকে ডেডহর্স পর্যন্ত ৪১৪ মাইলের জেমস ডালটন হাইওয়ে বছরে গড়ে ১০টি মৃত্যু দেখে (প্রতি মাইলে ০.০২৪ মৃত্যু), আলাস্কা পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী (২০২৪)। বিচ্ছিন্নতা, বরফের পিচ্ছিল পথ, এবং -৪০° সেলসিয়াস তুষারঝড় এর ঝুঁকি বাড়ায়। ২০১৪ সালে একটি ট্রাক দুর্ঘটনায় ৩ জন নিহত হয়। ২৪০ মাইলের সার্ভিস গ্যাপ উদ্ধারে বিলম্ব করে। স্যাটেলাইট ফোন এবং শীতকালীন সরঞ্জাম এখানে অপরিহার্য।

৮. জোজি লা পাস – ভারত

ভারতের শ্রীনগর থেকে লেহ পর্যন্ত এনএইচ-১ডি-র ৯ কিমি জোজি লা পাসে বছরে ৫০টি দুর্ঘটনা ঘটে, ভারতের বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী (২০২৫)। ৩,৫২৮ মিটার উচ্চতায় তুষার, বরফ, এবং ভূমিধস ঝুঁকি বাড়ায়। ২০১৭ সালে একটি বাস দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত হয়। গার্ডরেলের অভাব এবং সরু লেন এর বিপদ বাড়ায়। ২০২৬ সালে টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও, বর্তমানে টায়ার চেইন এবং আবহাওয়া পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৯. কারাকোরাম হাইওয়ে – পাকিস্তান/চীন

পাকিস্তান ও চীনের ১,৩০০ কিমি বিস্তৃত কারাকোরাম হাইওয়ে বছরে ৮০টি দুর্ঘটনা দেখে (প্রতি মাইলে ০.০৬ মৃত্যু), পাকিস্তান জাতীয় মহাসড়ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী (২০২৫)। ৪,৭০০ মিটার উচ্চতায় তুষারপাত, পাথর ধস, এবং সরু পথ ঝুঁকি বাড়ায়। বিচ্ছিন্নতার কারণে উদ্ধারে ১০ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। ২০২৪ সালে নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি বন্যার ঝুঁকি কমালেও, ফোর-হুইল ড্রাইভ এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ অত্যন্ত প্রয়োজন।

১০. সিচুয়ান-তিব্বত হাইওয়ে – চীন

চীনের ২,৪০০ কিমি বিস্তৃত সিচুয়ান-তিব্বত হাইওয়ে বছরে ২০০টি দুর্ঘটনা দেখে (প্রতি মাইলে ০.০৮৩ মৃত্যু), চীন পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী (২০২৫)। ৫,০০০ মিটার উচ্চতায় তুষারপাত, ভূমিধস, এবং তীক্ষ্ণ বাঁক ঝুঁকি বাড়ায়। ভারী ট্রাফিক এবং একক লেনের অংশ বিলম্ব ঘটায়। ২০২৪ সালে টানেল সম্প্রসারণে উন্নতি হলেও, অক্সিজেন ট্যাঙ্ক এবং ধীর গতিতে গাড়ি চালানো অপরিহার্য।

উপসংহার

বলিভিয়ার কুয়াশাচ্ছন্ন ডেথ রোড থেকে টেক্সাসের ভিড়পূর্ণ ইন্টারস্টেট ৪৫—এই সড়কগুলো প্রমাণ করে যে ভূখণ্ড, আবহাওয়া, এবং মানুষের ভুল কীভাবে মৃত্যুহার বাড়ায়। ২০২৫ সালে, সড়ক নিরাপত্তা বিশ্বব্যাপী অগ্রাধিকার হলেও, রক্ষণাবেক্ষণ, কঠোর আইন প্রয়োগ, এবং অবকাঠামোর উন্নতি জরুরি। চালকদের সতর্ক থাকতে হবে—আবহাওয়া পরীক্ষা করুন, বিভ্রান্তি এড়ান, এবং জরুরি প্রস্তুতি নিন। কোন সড়কের ঝুঁকি আপনাকে সবচেয়ে অবাক করেছে? নিচে আপনার মতামত জানান এবং নিরাপদ সড়কের জন্য সোচ্চার হোন।